• বর্জ্য এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা


আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার বা ভোগ করার পর অব্যবহারযোগ্য যে আবর্জনা তৈরি হয় সেগুলিকে বর্জ্য পদার্থ বলে। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন- এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। গুণগত বিবেচনায় এই বর্জ্য মোটা দাগে দু'ধরনের:

  1. তরল (লিকুইউ) ও
  2. কঠিন (সলিড)

সাধারণভাবে বর্জ্যের উৎস হিসেবে তিনটি ক্ষেত্রকে বিবেচনায় নেয়া হয়: 

  1. গৃহ বর্জ্য 
  2. গৃহের বাইরে প্রতিষ্ঠান বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য 
  3. মেডিকেল বর্জ্য

জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সমস্ত জীবকূলকে রোগের হাত থেকে রক্ষা, পরিবেশ দুষণ ও অবনমন রোধের উদ্দেশ্যে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলা হয়। 

সাধারণত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে বোঝায় বর্জ্য বস্তুর উৎপাদন কমানো। সমন্বিত এবং সম্পূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে RRR নীতি প্রয়োগ করা হয়। তিনটি R নীতি হলো- Reduce (কমানো), Re-use (পুনব্যবহার) এবং Recycle (পুনশ্চক্রীকরণ) ।

প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেই অর্থে না থাকায় এখন বর্জ্যের মাধ্যমেই সংক্রামক ও অসংক্রামক দু'ধরনের রোগই ছড়াচ্ছে৷ বর্জ্যে থাকা নানা ধরনের জীবাণু পানির সঙ্গে মিশে, শুকিয়ে বাতাসে ভেসে এবং মাটি ও চারপাশকে দূষিত করে তা আবার ছড়িয়ে পড়ে৷''

  • বর্জ্যের পরিমাণ

বাংলাদেশে বছরে শহরগুলোতে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ধরা হয় ২২.৪ মিলিয়ন টন অথবা বছরে মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৫০ কেজি৷ ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৭,০৬৪ টন৷

[নিচের তিনটি প্যারাগ্রাফে ঢাকা শহরের বর্জ্য এবং এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, এটি থেকে গাজীপুর শহরের একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে]

রাজধানী ঢাকায় মোট বর্জ্যের ৭০ ভাগই সলিড বর্জ্য বলে মনে করা হয়৷ বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা বলছে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে সাত হাজার মেট্রিক টনের মতো বর্জ্য উৎপাদিত হয়৷ ঢাকায় মাথাপিছু প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ৫৬০ গ্রাম৷

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রতিদিন ৬,১১০ টন গৃহস্থালি বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে৷ এর মধ্যে ঢাকার প্রত্যেক নাগরিক ৩৭৭ গ্রাম বর্জ্য উৎপাদন করে, যার ৯৭ শতাংশই জৈব পদার্থ৷ বাকি তিন শতাংশ বর্জ্য অজৈব৷ মেডিকেল এবং মেডিকেল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ১,০৫০ টন ও রাস্তাঘাট থেকে চারশ মেট্রিক টন বর্জ্য তৈরি হয়৷

বলা হয়ে থাকে, ঢাকায় উৎপাদিত বর্জ্যের ৭৬ ভাগই রিসাইকেল যোগ্য৷ তবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুরোটাই আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া হয়৷ অথচ সরকারি হিসেব মতেই ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণে বর্জ্য উৎপাদিত হয় তা থেকে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূলত একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় এবং ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং কারণ এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের মোট বর্জ্যের শতকরা ৩৭ ভাগ উৎপাদিত হয় রাজধানী ঢাকায় ৷ তাই এ শহরের ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠিয়ে দেয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন পরিকল্পিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডোর) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার একমাস পর উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য।

  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করতে পারে এমন ৩টি প্রতিষ্ঠান

1. Waste Concern (Website:https://wasteconcern.org; Address:Level-3, House No. 270, Road No. 19, New DOHS, Mohakhali, Dhaka-1206, Bangladesh; Phone:+880-2-48810-841, +880-2-48810-842; Mail:office@wasteconcern.org)
2. Garbageman (Website:https://garbageman.com.bd,  Address:H#64, Panna Plaza, Muktijodha Soroni Road, Dokhinkhan, Dhaka-1230.Email:garbagemanbd@gmail.com;Phone: 01845-464109)
3.Geocycle Bangladesh (Address:LafargeHolcim Bangladesh Limited; Ninakabbo, Level-7, 227/A Bir Uttam Mir Shawkat Sarak (Gulshan Tejgaon Link Road) Tejgaon Dhaka-1208, Bangladesh; Phone: +880 (2) 9881002-3; Email:hasnat.noor@lafargeholcim.com

  • যশোর পৌরসভা ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট

১. যশোর পৌরসভা ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ১৩.২৫ একর জমির উপর নির্মিত। যেটি একসময় পুরোটাই ছিল আবর্জনার ভাগার। 

২. ২০১৭ সালে ADB এর অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ২৪কোটি টাকা ব্যায়ে এই প্রকল্পটি নির্মিত হয়।

৩. প্রতিদিন ৪৫টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। (এক এক প্রতিবেদনে এক একরকম তথ্য দিয়েছে, আমি এখানে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার প্রতিবেদনের তথ্য ব্যবহার করেছি।) 

৪. এখান থেকে ১৮টন বর্জ্য ব্যবহার করে প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে ৭২০ঘন মিটার বায়োগ্যাস।যার অর্ধেক ব্যবহার করে প্রতিঘণ্টায় ৪২৮ কিউবিক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। যেটি দিয়ে চলছে এই ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কাজ

৫. পচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করে তৈরি করা হয় কম্পোস্ট সার। এই জৈব সার উৎপাদনে ব্যবহার হয় ৫ থেকে ৬টন বর্জ্য। প্রতিদিন ২-২.৫ টন জৈব সার তৈরি করা হয়।

    • গাজীপুরে বর্জ্য ও ব্যবস্থাপনায় যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করার খবর পাওয়া গেছে

    News-1

    গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছিষ্ট বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে জড়ো করে মেশিনে রিসাইক্লিং করে তা থেকে উৎপন্ন করা হবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস। 

    এ জন্য জাপানের সহায়তায় ১২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। আগামী ১০ মাসের মধ্যে এর উৎপাদন শুরু হবে। ফলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ায় যাবতীয় খরচ মিটিয়ে বছরে ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। 

    সিটিতে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব ক্রমশ্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। শহরের যত্রতত্র এমনকি প্রধান প্রধান সড়কে প্রতিদিন বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করা হচ্ছে।

    পরিচ্ছন্ন কর্মীদের দ্বারা এ সব বর্জ্য দায়সারাভাবে সংগ্রহ করে শহরের বাইমাইল এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ভোগড়া বাইপাস সড়কের পাশে স্তূপিকৃত করে রাখা হচ্ছে। বর্তমানে সেটিও আর বর্জ্য ধারণের পর্যায়ে নেই। 
    _যুগান্তর, ২৭ আগস্ট ২০১৯

    News-2

    গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩৬নং ওয়ার্ডের কাথােরা এলাকায় বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদন প্লান্ট উদ্বোধন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই, ২০২০) দুপুরে ইউরােপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহযােগিতায়, প্রাক্টিক্যাল এ্যকশন ও কর্মজীবী নারীর কারিগরিও ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ প্রান্ট উদ্বোধন করা হয়।

    কাথােরা এলাকায় নবনির্মিত এ প্লান্ট থেকে প্রতি
    উৎপাদন চক্রে ৩২ টন বর্জ্য ব্যবহার করে প্রায় ১১ টন জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। প্লান্টটির সফল
    বাস্তবায়নে গাজীপুর সিটি করপােরেশন থেকে সার্বিক সহযােগিতার আশ্বাস প্রদান করা হয়। 
    _বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৬জুলাই ২০২০

    News-3

    বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। সেই সঙ্গে নির্মাণ করা হবে বিভিন্ন বাস-ট্রাক টার্মিনাল। এ জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

    ৩৩ দশমিক ৩৩ একর জমি ব্যবহার করা হবে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজেল্যান্ড লিজ এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে ২০ বছরের জন্য গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ একর জমি একটি চাইনিজ কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়া হবে এবং জিসিসি থেকে দৈনিক ৩ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য সরবরাহ করা হবে। এর মাধ্যমে কোম্পানি ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। 
    _সারাবাংলা.নেট; জুন ১৭ ২০২১

    • বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

    সুইডেন

    সুইডেনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাফল্যের মূল হচ্ছে জনগণের সচেতনতা। এই দেশের নাগরিকরা বর্জ্যের ধরনের উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ব্যাগে বর্জ্য গুলো আলাদা করে রাখে।

    এরপর প্লান্টে এগুলো রিসাইকেবল এবং নন-রিসাইকেবল এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যেগুলো রিসাইকেবল সেগুলো স্বাভাবিক প্রসেসের মাধ্যমেই নতুন উপাদানে পরিণত করা হয়। অন্যদিকে যেগুলো রিসাইকেবল না সেগুলো প্লান্টে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয় যা ২লক্ষ ৫০ হাজার বাসাবাড়ির বিদূতের চাহিদা পূরণ করে। 

    জাপান

    বিশ্বের যেসব দেশ রিসাইক্লিংকে সবচেয়ে গুরুত্বসহকারে নেয় তার মধ্যে জাপান একটি। এর একটি উদাহরণ হলো জাপানের কামিকাতসু শহর। এটি একটি ছোট্ট শহর যা পর্বতে ঘেরা ফলে এই শহরে প্রবেশটা একটু কঠিন। ফলে অন্যান্য শহরে রিসাইক্লিং এর যে সুযোগ সুবিধা রয়েছে এই শহরে য়া নেই।

    তাই এই শহরের অধিবাসীরাই বর্জ্যকে ৩৪টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পরবর্তীতে রিসাইক্লিং সেন্টারে প্রেরণ করে। বর্তমানে এই শহরের রিসাইক্লিং রেট ৯০%। 

    জাপানের High Metal Recycling Rate-ও রয়েছে। আপনি জেনে অবাক হবেন যে টোকিও অলিম্পিকের মেডেল গুলো তৈরি করা হয় এই রিসাইকেল করা মেটাল বা ধাতু থেকে।

    কানাডা
     
    কানাডার নাগরিকরা যেসব পণ্য আর ব্যবহার করে না সেগুলো বিক্রি বা দান করে দেয়। এছাড়াও তারা টায়ার এমন ভাবে রিসাইকেল করে যেগুলো পরবর্তীতে পিচের সাথে মিশ্রিত করে রাস্তা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কানাডায় রাস্তায় রাস্তায় সিগারেটের বাট ফেলার জন্য বাক্স রয়েছে। 

    ওয়েলস

    মাত্র বিশ বছরে এই দেশের গৃহস্থালি বর্জ্য রিসাইক্লিং এর রেট ৫% থেকে ৬৫% এ উন্নীত হয়েছে। এই দেশ বহু পরিমাণে রিসাইক্লিং প্লান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। 

    এছাড়াও আরও অসংখ্য দেশ রয়েছে যারা বর্জ্যকে সম্পদে পরিনত করছে। জার্মানির কথা এদের মধ্যে কারও অজানা নয়। বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চ রিসাইক্লিং রেট রয়েছে এই দেশের (৫৬.১%) । এরপর যথাক্রমে রয়েছে অস্ট্রিয়া (৫৩.৮%), দক্ষিণ কোরিয়া (৫৩.৭%), ওয়েলস (৫২.২%), সুইজারল্যান্ড (৪৯.৭%)। 

    বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ চীনে প্লাস্টিক বর্জ্যসহ অন্যান্য বর্জ্য রপ্তানি করত। তবে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে চীন বর্জ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। 

    বর্জ্য নিয়ে প্রচলিত দুটো কথা হলো- আজকের বর্জ্য আগামীকালের সম্পদ এবং আবর্জনাই নগদ অর্থ। উন্নত দেশগুলোতে যেমন সুইডেন ও নরওয়েতে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহারযোগ্য লাভজনক ভিন্ন বস্তুতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। 

    বাংলাদেশেরও বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে বর্জ্য সংরক্ষণ, নিরপেক্ষায়ণ, নিষ্ক্রীয়করণ অথবা প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ব্যবহার উপযোগী বিভিন্ন নতুন জিনিস বানানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এতে পরিবেশের সাথে সাথে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে দেশ ও দেশের মানুষ।